বর্তমান সময়ে কম বয়সের মানুষকেও ব্রেইন স্ট্রোকের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগে সাধারণত বয়স ৬০-এর কাছাকাছি না পৌঁছালে স্ট্রোকের ঝুঁকি খুব কম দেখা যেত। কিন্তু আজকাল তরুণরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। সতর্কতা এবং প্রাথমিক সচেতনতা ছাড়া এই রোগ প্রাণঘাতী হতে পারে।
ব্রেইন স্ট্রোক কী
ব্রেইন স্ট্রোক দুই ধরনের হয়:
- ইস্কেমিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে।
- হেমোরেজ স্ট্রোক: মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে।
যে ধরনের স্ট্রোকই হোক না কেন, রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার চাবিকাঠি হলো সঠিক সময়ে লক্ষণ শনাক্ত করা ও চিকিৎসা শুরু করা।
কেন বাড়ছে স্ট্রোকের ঝুঁকি
- স্বাস্থ্যগত কারণ: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বেশি, হার্টের সমস্যা।
- অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন: কম বয়সেও ধূমপান, অ্যালকোহল, মাদক, বেশি ওজন, ফাস্টফুড।
- মানসিক ও শারীরিক চাপ: মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অল্প বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
- জিনগত ও হরমোনজনিত কারণ: গর্ভনিরোধক বা হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত ওষুধ রক্ত ঘন করে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া ও কম বডি মুভমেন্টও ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
- পুষ্টি ঘাটতি: ভিটামিন কম থাকা বা অপুষ্টিও স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
ব্রেইন স্ট্রোকের লক্ষণ: B-F-A-S-T পদ্ধতি
স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ চেনে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়। “B-F-A-S-T” হলো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা:
- B = Balance (ব্যালেন্স): হঠাৎ ভারমাস্য হারানো বা সমন্বয় নষ্ট হওয়া।
- F = Face (ফেস): মুখের একপাশ ঝুলে যাওয়া বা বেঁকে যাওয়া।
- A = Arm (আর্ম): একপাশের হাত বা পা অসাড় বা নড়াচড়া করতে অক্ষম।
- S = Speech (স্পিচ): কথা জড়িয়ে যাওয়া, সঠিকভাবে বলার অক্ষমতা।
- T = Time (টাইম): কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।
- I = Eyes (আই): চোখে দৃষ্টি ঝাপসা বা দ্ব্যর্থক দেখা।
অন্যান্য লক্ষণ: হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
স্ট্রোক মানেই মৃত্যু নয়
সঠিক সময়ে সিটি স্ক্যান এবং চিকিৎসা শুরু করলে রোগী সুস্থ হতে পারেন। আধুনিক চিকিৎসায় থ্রম্বোলাইসিস বা থ্রম্বেক্টমি করে রক্তনালী পরিষ্কার করা যায়, রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করা যায় এবং স্নায়ুকে অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক রাখা সম্ভব।
স্ট্রোক প্রতিরোধের পরামর্শ
- নিয়মিত ব্লাড প্রেশার, সুগার, কোলেস্টেরল পরীক্ষা।
- ধূমপান, অ্যালকোহল ও মাদক বর্জন।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্য: সবুজ শাক-সবজি, ফল, কম ফাস্টফুড ও মিষ্টি।
- শারীরিক ব্যায়াম: দৈনিক হাঁটাচলা, জগিং বা হালকা ব্যায়াম।
- মানসিক চাপ কমানো: বই পড়া, গাছের যত্ন, গান, নাচ, খেলাধুলা।
- পরিবারের কারো স্ট্রোক ইতিহাস থাকলে ২৫ বছর বয়সের পর থেকে নিয়মিত চেকআপ।
- গর্ভাবস্থায় রক্তের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ।
- মোবাইল স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ।
স্ট্রোকের পর যত্ন
- ফিজিওথেরাপি ও কাউন্সেলিং।
- প্রেশার, সুগার ও পেশির সমস্যা নিয়ন্ত্রণ।
- মূত্রথলির কার্যকারিতা এবং খাবার খাওয়ার অবস্থা নজর রাখা।
- রোগীর মানসিক শক্তি বাড়াতে প্রিয়জনের সহযোগিতা।
জিম বা ভারী ব্যায়াম
- শুরু করার আগে শারীরিক পরীক্ষা: ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, রক্তের ঘনত্ব।
- সুনির্দিষ্ট সময় ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যায়াম।
- ব্যায়ামের পর খাওয়া-দাওয়া, ধূমপান ও মিষ্টি এড়িয়ে চলুন।
- শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসক ও জিম ট্রেইনারের পরামর্শ নিন।
কম বয়সেও ব্রেইন স্ট্রোক হতে পারে, তাই সতর্ক থাকা, লক্ষণ চেনা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অত্যন্ত জরুরি।