সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি শিক্ষা সারা বাংলা বিশ্ব বাণিজ্য ইসলাম ও জীবন খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন প্রযুক্তি ভিডিও ছবি স্বাস্থ্য টিপস ক্যাম্পাস বিবিধ ধর্ম কর্পোরেট কর্নার ভ্রমণ সাহিত্য সোশ্যাল মিডিয়া সারাবাংলা

সখীপুরে অবস্থিত মোঘল যুগের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ

  • Company Logo
    ডেস্ক রিপোর্ট , বর্তমান
    প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫, বুধবার ০২:৪৭ পিএম
সখীপুরে অবস্থিত মোঘল যুগের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ
মোঘল যুগের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ

টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের দেওয়ান বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যশৈলীর একটি অপূর্ব নিদর্শন—ফকির বাড়ি জামে মসজিদ। প্রায় দুই শতাব্দী আগে মোঘল আমলের শেষদিকে নির্মিত এই মসজিদ আজও তার প্রাচীন গৌরব বজায় রেখে টিকে আছে, যেন এক জীবন্ত ইতিহাস।

স্থানীয়দের মতে, দেওয়ান পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা শাহ সুফি মোহাম্মদ গোমর আলী দেওয়ান ১৮৪০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ সমাজসেবী, যার নেতৃত্বে কচুয়া গ্রামে গড়ে ওঠে দেওয়ান পরিবার। মৃত্যুর পর তিনি পার্শ্ববর্তী বাসাইল উপজেলার করটিয়া পাড়ায় শায়িত হন।

মসজিদটির নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ইট, চুনাপাথর এবং সুরকি, যা মোঘল স্থাপত্যশিল্পের প্রতিফলন। প্রায় ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের এই মসজিদটির দেয়ালগুলো প্রায় ৪০ ইঞ্চি পুরু। মসজিদে পাঁচটি দরজা রয়েছে, প্রতিটির নকশায় সূক্ষ্ম কারুকাজ। ভেতরে ও বাইরে খোদাই করা নানা নকশা এবং ফুলপাতার অলংকরণ মসজিদটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

মসজিদের ছাদে ছোট-বড় মিলে মোট আটটি গম্বুজ রয়েছে, যা তার স্থাপত্যকে আরও অনন্য করে তুলেছে। প্রবীণ মুসল্লিরা জানান, এই মসজিদ নির্মাণে কোথাও লোহা বা রড ব্যবহার করা হয়নি, অথচ দেড় শতাব্দী পার হয়ে এখনও এর গঠন অটুট রয়েছে।

মসজিদটির চারপাশে প্রায় পাঁচ একর জমি রয়েছে, এবং এর পাশে একটি বিশাল পুকুর, যেখানে এখনো গ্রামের মানুষ অজু ও গোসল করে। পুকুরের চারপাশে গাছপালার ছায়ায় মসজিদ এলাকায় এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মসজিদের পাশে একটি প্রাচীন কবরস্থানও রয়েছে, যেখানে শাহ সুফি মোহাম্মদ গোমর আলী দেওয়ানসহ তার বংশধরেরা শায়িত আছেন।

মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি বিশাল ঈদগাহ মাঠ রয়েছে, যেখানে প্রতি ঈদে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মুসল্লি একত্র হয়ে নামাজ আদায় করেন। মসজিদে নিয়মিত ওয়াক্তের নামাজে শতাধিক মুসল্লি অংশ নেন, এবং বিশেষ ধর্মীয় দিনে ভিড় আরও বেড়ে যায়। মসজিদটির ভেতরে একসাথে প্রায় তিনশো মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন।

প্রতিদিন সকালে মসজিদে শিশুদের কুরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। স্থানীয় ইমাম আইন উদ্দিন নিয়মিত এই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, “এই ঐতিহাসিক মসজিদের ইমামতি করা আমার জন্য পরম সৌভাগ্য।”

দেওয়ান পরিবার প্রায় ছয় থেকে সাত প্রজন্ম ধরে এই মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছে, এবং বর্তমানে মসজিদের মুতাওয়াল্লি হচ্ছেন মাহমুদা হাবীব, বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান হাবিবুর রহমানের স্ত্রী। তিনি জানান, প্রায় দুই শতাব্দী আগে নির্মিত এই মসজিদটি এখনও অক্ষত রয়েছে, যা মোঘল আমলের স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলী সিকদার বলেন, "এই মসজিদ আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি বহন করছে। সখীপুরে এর সমসাময়িক আর কোনো মসজিদ আমি দেখিনি। এটি আমাদের গৌরব।"

প্রবীণ মুসল্লি হালিম সিকদার জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই মসজিদে নামাজ পড়ে আসছেন, এবং শুনেছেন এর বয়স দুই শতাব্দীরও বেশি। স্থানীয় তরুণ মাহাদী হাসান বলেন, “এটি একটি ব্যতিক্রমী সৌন্দর্যের মসজিদ। শান্ত পরিবেশে নামাজ পড়তে আসা মানুষদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।”

প্রায় দুই শতাব্দী পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা ফকির বাড়ি মসজিদ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি টাঙ্গাইল সখীপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকলার এক জীবন্ত সাক্ষী। এই মসজিদটি এখনো শান্তির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এবং অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের একটি নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে।


মন্তব্য